Ramjanul Mubarak

 In Activities

রমজান ছবরের মাস:

রমজানের শ্রেষ্ঠত্ব সম্পর্কে রাসুলে পাক (সাঃ) বলেন, “রমজান ছবরের মাস এবং ছবরের প্রতিদান হইল জান্নাত।“ বার মাসে এক বৎসর। বারটি মাসের মধ্যে কেবলমাত্র রমজানকে ছবরের মাস হিসেবে চিন্নিত করা হইল। কেন? ছবর আরবী শব্দ। ইহার আভিধানিক অর্থ নাফসের উপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ লাভ করা, সংযম অবলম্বন করা, স্থির থাকা এবং বিপদে-আপদে অবিচল থাকা তথা ধৈয্য ধারন করা ইত্যাদি। রমজান ছবরের মাস–ইহা উপলব্ধির জন্য ছবরের আভিধানিক অর্থের বিশ্লেষণমূলক আলোচনা প্রয়োজন। বলা হইল ছবর অর্থ নাফসের উপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ লাভ করা। তাহা কিভাবে সম্ভব? এবং ইহার সাথে রমজানের কি সম্পর্ক?
এখানে মানবদেহের তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ দরকার। মানবদেহে দুই বিপরীতধর্মী শক্তি বা সত্ত্বা বর্তমান। একটি মানব রুহ অপরটি নাফস। একটি শুভ অপরটি অশুভ। একটি খোদামুখী অপরটি খোদাবিমুখী। প্রথমটি আলোর দিকে পথ দেখায়, দ্বিতীয়টি অন্ধকারের দিকে পরিচালিত করে। মানবরুহের সহযোগী বা সাহায্যকারী হিসাবে মনবদেহে আছে আলমে আমরের চারটি লতিফা, জথাঃ কালব, ছের, খফি ও আখফা। অপরদিকে নাফসের সহযোগী হিসেবে আছে দেহস্থিত চারটি জড় উপাদান, তথা আগুন,পানি, মাটি ও বাতাস। রুহের পক্ষে মদদ দাতা হিসেবে কাজ করেন নবী-রাসূল ও ওলী-আল্লাহসকল। অন্যদিকে নাফসের মদদদাতা হইল অভিশপ্ত শয়তান। মানবদেহে রুহ ও নাফস পরস্পর সম্মুখ সমরে লিপ্ত। যে মানবের রুহ তদীয় নাফসের কাছে পরাজিত, সে মানব নামে কলংক; সে মানবরুপী পশু। অন্যদিকে যে মানুষের নাফস তদীয় রুহের নিকট পরাস্ত, সেই সত্যিকারের মানব। তাহার রুহ জাগ্রত, অন্তর পরিশোধিত। তবে নাফসকে পরাস্ত করা সহজ কথা নয়। এখানে প্রয়োজন এক আশ্চর্য শক্তি। যে শক্তিবলে রুহ নাফসকে পরাস্ত করিতে সক্ষম হয়। সেই শক্তিকেই ছবর বলা হয়। আর নাফসকে পরাস্ত করার অনুকূল শক্তি রমজানের বদৌলতে অতি সহজে মানবদেহে উৎপন্ন হয়। কারন রমজান মাসে শয়তানকে বন্দী রাখা হয়, শৃঙ্খলিত করা হয়। ফলে দেহস্থিত দুষ্ট নাফস শয়তান হইতে যে মদদ বা সাহায্য পাইত, তাহা বন্ধ থাকে। শয়তানের সাহায্য বন্ধ হওয়ায় নাফস এমনিতেই দিশেহারা হয়। তদুপরি সিয়াম সাধনায় দেহে যে অগ্নি পয়দা হয় তাহা অত্যাধুনিক অ্যাটমিক অস্ত্রের চেয়েও নাফসকে দুর্বল করার ক্ষেত্রে অধিক কার্যকরী ভূমিকা রাখে। ফলে সহজেই রুহ নাফসের উপরে নিজ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করিতে পারে। অর্থাৎ সিয়াম পালনকারী মানুষ রমজানের বদৌলতে সহজেই ছবরের গুন অর্জন করিতে পারে। রমজান ব্যতীত অন্য এগারো মাসে এই কাজ তথা নাফসের উপর নিয়ন্ত্রণ লাভ করা সহজ হয়না। কারনঃ
শয়তান তখন মুক্ত বা স্বাধীন থাকে। সে পুনরায় নাফসকে রুহের উপর বিজয়ী হইতে মদদ দেয় এবং
রমজান ব্যতীত অপর এগারটি মাসে মাসব্যাপী সিয়াম সাধনার কোন ব্যবস্থা বা পদ্ধতি শরীয়তে নাই। কাজেই বুঝা যায়, নাফসের উপর স্বীয় নিয়ন্ত্রণ লাভের সব চাইতে উপযুক্ত সময় রমজান। রাসুলে পাক (সাঃ) তাই রমজানকে “ছবরের মাস” বলিয়া আখ্যায়িত করিয়াছেন।
নাফসের স্বভাব এবং নাফসকে হেদায়েতপূর্বক স্বীয় বশে আনিবার কাজে রমজানের ভূমিকা সম্পর্কে জনৈক বুজুর্গ বলেন-“মানুষের নাফস এবং দেহের সমস্ত দাবী-দাওয়ার মধ্যে তিনটি দাবী হইতেছে মূল। বস্ততঃ এই তিনটি দাবীই অধিকতর শক্তিশালী।
ক্ষুধার দাবী। জীবন রক্ষা একমাত্র ইহারই উপর নির্ভরশীল।
যৌন আবেগের দাবী। মানুষের বংশ তথা মানব জাতির স্থিতির ইহাই একমাত্র উপায়।
শান্তি ও বিশ্রাম গ্রহনের দাবী। অর্থাৎ কর্ম শক্তিকে নূতন করিয়া জাগ্রত ও বলিষ্ঠ করিয়া তুলবার জন্য ইহা অপরিহার্য।
মানুষের এই তিনটি দাবী যদি নিজ নিজ সীমার মধ্যে থাকে তবে বিশ্ব প্রকৃতির অন্তর্নিহিত ভাবধারার অনুরূপ হইবে সন্দেহ নাই। অন্যদিকে নাফস এবং দেহের এই তিনটি দাবীই হইতেছে বড় বিপদ-একটু সুযোগ পাইলেই মানুষের ‘খুদী” কে বন্দী করিয়া দাসানুদাস বানাইয়া লয়। ফলে প্রত্যেকটি দাবী হইতে অসংখ্য দাবীর একটি দীর্ঘ ফিরিস্তি বাহির হইয়া পড়ে। ফলে প্রত্যেকটি মানুষ জীবনের উদ্দেশ্য, নিয়মনীতি এবং কালবের ঐকান্তিক নির্দেশ ভুলিয়া একমাত্র উহারই দাবী পূর্ণ করিতে নিযুক্ত হয়।

দুর্বল খুদী এইসব দাবীর নিকট পরাভূত হইলে মানুষ খাদ্যের পেটের জন্য দাস হয়, যৌন ক্ষুধা নিবারণের জন্য পশু অপেক্ষাও নিম্নস্থরে নামিয়া যায় এবং দেহের বিশ্রাম প্রিয়তা তাহার ইচ্ছা শক্তিকে বিলোপ করে । তখন সে আর তাহার নাফসের বা দেহের শাসক থাকে না বরং সে উহার অনুগত দাসে পরিনত হয় এবং নির্দেশ সমূহকে ভাল-মন্দ, সঙ্গত-অসঙ্গত সকল উপায়ে পালন করিতে বাধ্য হয়। সিয়াম মানুষের এই তিনটি লালশা-বাসনাকে নিয়ন্ত্রিত করিয়া নিয়মানুগ করিয়া তোলে এবং “খুদী” কে উহার উপর প্রভাব ও আধিপত্য বিস্তারে অভ্যস্ত করে। সিয়াম পালনকারী মুমিন ব্যক্তির “খুদী” যদি বাস্তবিকই আল্লাহর অধীন ও অনুগত হইয়া থাকে, তাহার ইচ্ছা শক্তিতে যদি নাফসকে নিয়ন্ত্রিত করিবার মত জোর থাকে তবে সে নিজেই আহারের উদগ্র আগ্রহ , যৌন ক্ষুধা ও লালসা এবং বিশ্রাম প্রিয়তাকে সিয়ামের উপস্থাপিত অসাধারন নিয়মনীতির বন্ধনে নিজেই মজবুত করিয়া বাধিয়া দিবে। বালেগ হইবার পর হইতে মৃত্যু পর্যন্ত প্রতি বৎসর দীর্ঘ একটি মাস মোমিনের এই কঠিন অনুশীলনের মধ্যেই ব্যয়িত হওয়ায় নাফসের উপর খুদীর বাধন বার বার নূতন ও শক্ত হইয়া যায়। এই যে নাফসের উপর খুদীর বাধন – ইহাই যথার্থ ছবর; যাহা রমজানের সিয়াম সাধনায় সহজেই অর্জিত হয়।
– বিশ্বওলী হযরত মাওলানা খাজাবাবা ফরিদপুরী (কুঃ ছেঃ আঃ) ছাহেবের মহা পবিত্র নসিহত “রমজান ও ঈদ” (নসিহত নং ১২৪)থেকে সংগৃহীত।

 

This slideshow requires JavaScript.

Contact Us

Thank you for contacting CPHD. We will get back to you shortly.

Not readable? Change text.